এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ২০২৬ | বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন
দেশের শিক্ষা খাতের একটি বিশাল অংশ পরিচালিত হয় বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার দ্বারা। আর এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত লাখ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হলো সরকারি অনুদান বা এমপিও। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এবং বিশেষ করে নবম পে-স্কেল নিয়ে সবার মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।
২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট, জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫, এবং “বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২১” এর আলোকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কত, গ্রেড কত, উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা এবং সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধার তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিয়ে আজকের এই বিস্তারিত কন্টেন্ট।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কত?
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে যে, মাস শেষে একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক আসলে কত টাকা বেতন হাতে পান। এই হিসাবটি বোঝার জন্য আমাদের মূল বেতন বা বেসিকের সাথে যুক্ত হওয়া অন্যান্য ভাতা এবং কর্তন সম্পর্কে জানতে হবে।
বেতনের সাধারণ সমীকরণ (১০ম গ্রেড বিএডধারী সহকারী শিক্ষকের ক্ষেত্রে):
একজন ১০ম গ্রেডের শিক্ষক যিনি বিএড (B.Ed) ডিগ্রি সম্পন্ন করে যোগদান করেছেন, তার বেতনের হিসাবটি নিম্নরূপ:
- মূল বেতন (বেসিক): ১৬,০০০/- (সরকারি ও বেসরকারি অংশ মিলে)
- বাড়ি ভাড়া ভাতা: ২,০০০/- (নতুন নিয়মে ন্যূনতম)
- চিকিৎসা ভাতা: ৫০০/-
- মোট প্রাপ্তি: ১৮,৫০০/-
বেতন থেকে কর্তন:
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য শিক্ষকদের মূল বেতন থেকে ১০ শতাংশ টাকা কেটে রাখা হয়।
- কর্তন (১৬,০০০ এর ১০%): ১,৬০০/- টাকা
- মাস শেষে ব্যাংক হিসাবে নিট প্রাপ্তি: ১৬,৯০০/- টাকা
দ্রষ্টব্য: জুলাই মাস থেকে প্রস্তাবিত পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে এই হিসাবের ব্যাপক পরিবর্তন হবে। তখন বিশেষ সুবিধা বাতিল হয়ে মূল বেতনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন স্কেল ও গ্রেড তালিকা ২০২৬
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন পদের বিপরীতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ও স্কেলের একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো। এই তালিকাটি দেখলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন কোন পদে কত টাকা বেসিক বেতন পাওয়া যায়।
- অধ্যক্ষ (ডিগ্রি কলেজ): ৪র্থ গ্রেড (মূল বেতন ৫০,০০০/- থেকে শুরু)
- উপাধ্যক্ষ/প্রধান শিক্ষক: ৭ম গ্রেড (মূল বেতন ২৯,০০০/- থেকে শুরু)
- সহকারী অধ্যাপক: ৬ষ্ঠ গ্রেড (মূল বেতন ৩৫,৫০০/- থেকে শুরু)
- প্রভাষক (উচ্চ মাধ্যমিক বা ডিগ্রি কলেজ): ৯ম গ্রেড (মূল বেতন ২২,০০০/- থেকে শুরু)
- সহকারী শিক্ষক (বিএড ডিগ্রিধারী): ১০ম গ্রেড (মূল বেতন ১৬,০০০/- থেকে শুরু)
- সহকারী শিক্ষক (বিএড ছাড়া): ১১তম গ্রেড (মূল বেতন ১২,৫০০/- থেকে শুরু)
উল্লেখ্য যে, প্রতি বছর ১ জুলাই শিক্ষকদের মূল বেতনের ওপর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়।
নবম পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতনের খবর
সরকারি চাকরিজীবী ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা এসেছে, যা নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
কী থাকছে নতুন পে-স্কেলে?
এই পে-স্কেলের আওতায় শিক্ষকদের মূল বেতন বা বেসিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে, একটি বড় পরিবর্তন হলো, নতুন বেতন কাঠামো চালু হলে বর্তমানে চালু থাকা ১০ থেকে ১৫ শতাংশের “বিশেষ সুবিধা”টি আর বহাল থাকবে না।
পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর সম্ভাব্য বেতন:
- অধ্যক্ষ (৪র্থ গ্রেড): বর্তমানে বিশেষ সুবিধাসহ বেসিক ৫৫ হাজার টাকা। নতুন কাঠামোতে ৫০% বৃদ্ধিতে তা দাঁড়াবে ৭৫ হাজার টাকায়।
- সহকারী অধ্যাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড): বর্তমান বেসিক (বিশেষ সুবিধাসহ) ৩৯,০৫০ টাকা। নতুন কাঠামোতে হবে ৫৩,২৫০ টাকা।
- প্রভাষক (৯ম গ্রেড): বর্তমান বেসিক (বিশেষ সুবিধাসহ) ২৪,২০০ টাকা। নতুন কাঠামোতে হবে ৩৩,০০০ টাকা।
- সহকারী শিক্ষক (বিএডধারী, ১০ম গ্রেড): বর্তমান বেসিক (বিশেষ সুবিধাসহ) ১৮,৪০০ টাকা। নতুন কাঠামোতে হবে ২৪,০০০ টাকা।
এই অঙ্কগুলো পে-কমিশনের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর এই সংখ্যার সামান্য পরিবর্তন হতে পারে।
১০ম গ্রেডে বেতন পেতে হলে করণীয় কী?
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদানের ক্ষেত্রে বিএড (B.Ed) ডিগ্রির ভূমিকা অপরিসীম।
- সরাসরি ১০ম গ্রেড: যদি কোনো শিক্ষক নিয়োগের সময়ই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক এবং বিএড ডিগ্রিধারী হন, তবে তিনি সরাসরি ১৬,০০০ টাকা মূল বেতনে ১০ম গ্রেডে যোগদান করবেন।
- ১১তম থেকে ১০ম গ্রেড: যদি কোনো সহকারী শিক্ষক বা সহকারী মৌলভী বিএড ছাড়া ১১তম গ্রেডে ১২,৫০০ টাকা মূল বেতনে যোগ দেন, তবে তাকে ৫ বছরের মধ্যে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ বা অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষায় ডিগ্রি (বিএড/সমমান) অর্জন করতে হবে। ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি জাতীয় বেতন স্কেলের ১০ম গ্রেডে বেতন-ভাতাদি প্রাপ্য হবেন।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বৈশাখী ভাতা ও উৎসব ভাতা
বেসরকারি শিক্ষকদের উৎসব ভাতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। ২০০৪ সালের এক নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষকরা এখনো মূল বেতনের মাত্র ২৫ শতাংশ এবং কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা পেয়ে আসছেন। সম্প্রতি উৎসব ভাতা ১০ শতাংশ বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে উঠেছিল, তবে অর্থ মন্ত্রণালয় আপাতত সেটি স্থগিত করেছে।
অন্যদিকে, বৈশাখী ভাতার ক্ষেত্রে একটি সুখবর রয়েছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ বা বৈশাখী ভাতা পেয়ে থাকেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে (১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) এই ভাতা ইএফটি (EFT) এর মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠানো হয়েছে।


সরকারি ও বেসরকারি সুযোগ-সুবিধার তুলনামূলক চিত্র ২০২৬
বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সাথে সরকারি শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধার বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তা তুলে ধরা হলো:
| সুবিধার ধরণ | সরকারি শিক্ষক-কর্মচারী | এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী |
| বাড়ি ভাড়া ভাতা | মূল বেতনের ৪৫%, ৫০% বা ৬০% (এলাকাভেদে) | নির্ধারিত (সাধারণত ১০০০-২০০০ টাকা) |
| চিকিৎসা ভাতা | ১,৫০০/- টাকা | মাত্র ৫০০/- টাকা |
| উৎসব ভাতা | মূল বেতনের ১০০% | শিক্ষকদের ২৫%, কর্মচারীদের ৫০% |
| বৈশাখী ভাতা | ২০% (প্রাপ্য হন) | ২০% (প্রাপ্য হন) |
| বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট | ৫% বা তার বেশি | নির্ধারিত ৫% হারে |
| বিশেষ সুবিধা | ১৫% (বিদ্যমান) | ১০%-১৫% (নবম পে-স্কেলে বাতিলের প্রস্তাবিত) |
| অবসর ভাতা কর্তন | প্রযোজ্য নয় (জিপিএফ সুবিধা) | বেতনের ১০% (কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা) |
বেসরকারি হাই স্কুল ও কলেজের কর্মচারীদের বেতন কত?
এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী যেমন- অফিস সহায়ক, হিসাব সহকারী, নৈশপ্রহরী বা আয়াদের বেতন কাঠামো তাদের নিজস্ব গ্রেড অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
- ১৬তম গ্রেড (অফিস সহকারী/হিসাব সহকারী): বর্তমান মূল বেতন ৯,৩০০ টাকা। ১৫% বিশেষ সুবিধাসহ বেসিক হয় ১০,৬৯৫ টাকা।
- ১৮তম গ্রেড (ল্যাব সহকারী): বর্তমান মূল বেতন ৮,৮০০ টাকা।
- ২০তম গ্রেড (অফিস সহায়ক/নিরাপত্তাকর্মী/আয়া): বর্তমান মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা। সাথে বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা যোগ হয়। তারা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে বছরে দুটি উৎসব ভাতা পেয়ে থাকেন। নতুন পে-স্কেলে এদের মূল বেতন ১২,৩৭৫ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কি কোনো বিশেষ সুবিধা আছে?
বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা গ্রেড ভেদে মূল বেতনের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে জুলাই থেকে প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল কার্যকর হলে এই বিশেষ সুবিধা বাতিল হয়ে মূল বেতন একযোগে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বেসরকারি হাই স্কুলের শিক্ষকদের বেতন কত?
একজন নতুন সহকারী শিক্ষক বিএড ডিগ্রি নিয়ে যোগ দিলে ১০ম গ্রেডে মূল বেতন পান ১৬,০০০ টাকা। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা যোগ হয়ে এবং ১০% অবসর তহবিলে কর্তনের পর তিনি মাস শেষে প্রায় ১৬,৯০০ টাকা হাতে পান।
মাদ্রাসার দাখিল সুপার বা সহকারী মৌলভীদের বেতন স্কেল কেমন?
মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন স্কেলও স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের মতোই জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। সহকারী মৌলভীরা যোগ্যতার ভিত্তিতে ১০ম বা ১১তম গ্রেডে বেতন পান।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা কি ১০০% উৎসব ভাতা পাবেন?
শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে ১০০% উৎসব ভাতার দাবি জানিয়ে আসলেও বর্তমানে তারা মূল বেতনের ২৫% উৎসব ভাতা পান। সম্প্রতি এটি বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব উঠলেও তা আপাতত অর্থ মন্ত্রণালয়ে স্থগিত রয়েছে।
স্কুলের আয়া পদের কাজ কী এবং বেতন কত?
আয়াদের মূল কাজ হলো বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং শিক্ষকদের কাজে সহায়তা করা। তারা সাধারণত ২০তম গ্রেডে বেতন পান, যার বর্তমান মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা।
উপসংহার
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সরকারের নানা পদক্ষেপ ও নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাবনা শিক্ষক সমাজের জন্য আশাব্যঞ্জক। যদিও বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি, তবে বেতন কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং ইএফটি ব্যবস্থা শিক্ষা খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।





