সরকারি বাড়ি ভাড়ার তালিকা ২০২৬ | সরকারি চাকরিজীবীদের বাসা ভাড়া
সরকারি চাকরিতে মূল বেতনের পর একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর আয়ের সবচেয়ে বড় অংশটি হলো ‘বাড়ি ভাড়া ভাতা’। আপনি কোন এলাকায় কর্মরত আছেন এবং আপনার মূল বেতন কত, তার ওপর ভিত্তি করেই এই ভাতার পরিমাণ নির্ধারিত হয়।
বর্তমান ২০২৬ সালেও সরকারি কর্মচারীদের বাড়ি ভাড়া মূলত ‘জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫’ এর অনুচ্ছেদ ১৭ মোতাবেক নির্ধারিত হচ্ছে। তবে নতুন পে-স্কেলের আলোচনা চলায় অনেকেই নিজেদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাড়ি ভাড়ার হিসাবটি নিয়ে কৌতূহলী। আজকের এই বিস্তারিত গাইডে আমরা সরকারি বাড়ি ভাড়ার তালিকা, এলাকাভিত্তিক ভাতার চার্ট, বাসা ভাড়া সংক্রান্ত সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলী এবং নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য প্রভাব অত্যন্ত সহজ ভাষায় তুলে ধরব।
এলাকাভিত্তিক সরকারি কর্মচারীদের বাড়ি ভাড়ার তালিকা
সরকারি কর্মচারীদের কর্মস্থলকে বাড়ি ভাড়ার সুবিধার জন্য মূলত তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে:
১. ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকা।
২. অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন (চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর) এবং সাভার পৌর এলাকা।
৩. অন্যান্য স্থান (জেলা ও উপজেলা শহর/গ্রাম)।

নিচের টেবিল থেকে আপনার মূল বেতন এবং কর্মস্থলের এলাকা অনুযায়ী বাড়ি ভাড়ার সঠিক হার ও ন্যূনতম পরিমাণটি দেখে নিতে পারেন:
| মূল বেতনের ধাপ | ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকা | অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন ও সাভার পৌর এলাকা | অন্যান্য স্থান / উপজেলা পর্যায় |
| ৯,৭০০/- টাকা পর্যন্ত | মূল বেতনের ৬৫% (ন্যূনতম ৫,৬০০ টাকা) | মূল বেতনের ৫৫% (ন্যূনতম ৫,০০০ টাকা) | মূল বেতনের ৫০% (ন্যূনতম ۴,৫০০ টাকা) |
| ৯,৭০১/- হতে ১৬,০০০/- টাকা | মূল বেতনের ৬০% (ন্যূনতম ৬,৪০০ টাকা) | মূল বেতনের ৫০% (ন্যূনতম ৫,৪০০ টাকা) | মূল বেতনের ৪৫% (ন্যূনতম ৪,৮০০ টাকা) |
| ১৬,০০১/- হতে ৩৫,৫০০/- টাকা | মূল বেতনের ৫৫% (ন্যূনতম ৯,৬০০ টাকা) | মূল বেতনের ৪৫% (ন্যূনতম ৮,০০০ টাকা) | মূল বেতনের ৪০% (ন্যূনতম ৭,০০০ টাকা) |
| ৩৫,৫০১/- বা তদূর্ধ্ব | মূল বেতনের ৫০% (ন্যূনতম ১৯,৫০০ টাকা) | মূল বেতনের ৪০% (ন্যূনতম ১৬,০০০ টাকা) | মূল বেতনের ৩৫% (ন্যূনতম ১৩,৮০০ টাকা) |
(নোট: যদি আপনার মূল বেতনের নির্ধারিত শতাংশ হিসাব করার পর তা ‘ন্যূনতম টাকার’ চেয়ে কম হয়, তবে আপনি ওই ‘ন্যূনতম টাকাটিই’ বাড়ি ভাড়া হিসেবে প্রাপ্য হবেন)।
নবম পে-স্কেল ও বাড়ি ভাড়া ভাতার আপডেট
দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও পে-কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলে কর্মচারীদের মূল বেতন প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
যেহেতু বাড়ি ভাড়া ভাতা সরাসরি মূল বেতনের শতকরা হার অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, তাই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এবং মূল বেতন বৃদ্ধি পেলে, সকল কর্মচারীর বাড়ি ভাড়া ভাতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
উদাহরণস্বরূপ: বর্তমানে ১০ম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ১৬,০০০ টাকা হলে তিনি এলাকাভেদে ৪,৮০০ থেকে ৬,৪০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পান। নতুন পে-স্কেলে তার মূল বেতন যদি ২৪,০০০ টাকায় উন্নীত হয়, তবে বর্তমান শতকরা হার অনুযায়ী তার বাড়ি ভাড়াও আনুপাতিক হারে অনেক বেড়ে যাবে। তবে, নতুন পে-স্কেলে বাড়ি ভাড়ার বর্তমান শতকরা হার (৩৫%-৬৫%) পুনর্নির্ধারণ করা হবে কি না, তা চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ২০১৫ সালের স্কেল অনুযায়ীই ভাতা প্রদান অব্যাহত থাকবে।
সরকারি বাড়ি ভাড়া নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলী
শুধু শতকরা হার জানলেই হবে না, বাড়ি ভাড়া প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সরকারি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে। নিয়মগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
সরকারি বাসস্থানে বসবাস করলে
যে সকল সরকারি কর্মচারী সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত বাসস্থানে বসবাস করেন, তারা নগদ কোনো বাড়ি ভাড়া ভাতা পাবেন না। পূর্বে সরকারি বাসায় থাকলে মূল বেতন থেকে ৫%-৭.৫% হারে অতিরিক্ত অর্থ কর্তন করা হতো, কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে এই কর্তন প্রথা বাতিল করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখন আপনি ভাতা পাবেন না, তবে বাড়তি টাকাও কাটা হবে না।
স্বামী-স্ত্রী উভয়ই চাকরিজীবী হলে
যদি স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং তারা একত্রে একটি সরকারি বাসস্থানে বসবাস করেন, তবে যার নামে বাসাটি বরাদ্দ করা হয়েছে তিনি কোনো বাড়ি ভাড়া ভাতা পাবেন না। তবে অপরজন (স্বামী বা স্ত্রী) প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তার নিজ কর্মস্থলের হারে পূর্ণ বাড়ি ভাড়া ভাতা প্রাপ্য হবেন।
সংযুক্তিতে কর্মরত থাকলে
কোনো সরকারি কর্মচারী যদি তার মূল পোস্টিংয়ের বাইরে অন্য কোনো স্থানে সংযুক্তিতে কর্মরত থাকেন, তবে তিনি বর্তমানে যে এলাকায় অবস্থান করে দায়িত্ব পালন করছেন (প্রকৃত আবাসস্থল), সেই এলাকার হারেই বাড়ি ভাড়া পাবেন। মূল কর্মস্থলের হারে নয়।
মেস বা হোস্টেলে থাকলে
যদি জনস্বার্থে কোনো কর্মচারীকে মেস, হোস্টেল, ডরমেটরি বা ডাকবাংলোতে একটি একক সিট বা একক কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তবে সেটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি বাসস্থান হিসেবে গণ্য হবে না। এক্ষেত্রে ওই কর্মচারী তার বাড়ি ভাড়া ভাতা পাবেন, তবে সিটের বা কক্ষের জন্য নির্ধারিত ভাড়া তাকে কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করতে হবে।
নিজস্ব বাড়ি থাকলে
যে সকল কর্মচারীর নিজ নামে বা তার ওপর নির্ভরশীল কারও নামে কর্মস্থলে নিজস্ব বাড়ি রয়েছে, তাদের বাড়ি ভাড়া পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে জারি করা বাসস্থান বরাদ্দ নিয়মাবলী বলবৎ থাকবে।
বাড়ি ভাড়ার পাশাপাশি অন্যান্য ভাতা ২০২৬
সরকারি চাকরিজীবীরা বাড়ি ভাড়ার পাশাপাশি জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য আরও কিছু আর্থিক ভাতা পেয়ে থাকেন:
- চিকিৎসা ভাতা: পদের গ্রেড নির্বিশেষে সকল কর্মচারীর জন্য মাসিক ১,৫০০ টাকা (প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেলে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে)।
- শিক্ষা ভাতা: সন্তানদের পড়াশোনার জন্য (সর্বোচ্চ দুইজন) মাসিক ৫০০ টাকা করে মোট ১,০০০ টাকা। (নতুন পে-স্কেলে এটি ২,০০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে)।
- যাতায়াত ও টিফিন ভাতা: সাধারণত ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা এবং টিফিন ভাতা ২০০ টাকা প্রদান করা হয়। (নতুন পে-স্কেলে টিফিন ভাতা ১,০০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে)।
- ধোলাই ভাতা: প্রযোজ্য পদ অনুযায়ী মাসিক ১০০ টাকা।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় সর্বনিম্ন বাড়ি ভাড়া কত?
ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বা মেট্রোপলিটন এলাকায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য সর্বনিম্ন বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫,৬০০ টাকা।
সরকারি কোয়ার্টারে থাকলে কি বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়?
না, কোনো সরকারি কর্মচারী যদি সরকারি কোয়ার্টার বা বাসস্থানে বসবাস করেন, তবে তিনি মাসিক বেতন বিলের সাথে কোনো নগদ বাড়ি ভাড়া ভাতা প্রাপ্য হবেন না।
স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সরকারি চাকরিজীবী হলে বাসা ভাড়া কে পাবেন?
তারা যদি একই সরকারি বাসায় থাকেন, তবে যার নামে বাসা বরাদ্দ তিনি ভাতা পাবেন না, কিন্তু অপরজন তার নিজ বেসিক অনুযায়ী সম্পূর্ণ বাড়ি ভাড়া ভাতা পাবেন। আর যদি তারা সরকারি বাসায় না থেকে বাইরে ভাড়া বাসায় থাকেন, তবে দুজনেই তাদের নিজ নিজ বেসিক অনুযায়ী সম্পূর্ণ বাড়ি ভাড়া ভাতা পাবেন।
বাড়ি ভাড়া ভাতা কি ইনক্রিমেন্টের সাথে বাড়ে?
হ্যাঁ, প্রতি বছর জুলাই মাসে যখন আপনার মূল বেতন বা বেসিক ৫% হারে বৃদ্ধি পায়, তখন সেই বর্ধিত মূল বেতনের ওপর ভিত্তি করেই নতুন করে আপনার বাড়ি ভাড়া ভাতার হিসাব করা হয়।
নতুন পে-স্কেল চালু হলে কি বাড়ি ভাড়া বাড়বে?
অবশ্যই। যেহেতু বাড়ি ভাড়া মূল বেতনের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ হারে দেওয়া হয়, তাই নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে বাড়ি ভাড়ার পরিমাণও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।





