ই পাসপোর্ট করতে কত টাকা লাগে? ৫ বছর ও ১০ বছর মেয়াদি ই পাসপোর্ট ফি ২০২৬
আধুনিক যুগে বিদেশ ভ্রমণ, চিকিৎসা, পড়াশোনা কিংবা ব্যবসার কাজে পাসপোর্ট একটি অত্যাবশ্যকীয় ডকুমেন্ট। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার ই-পাসপোর্ট (e-Passport) ব্যবস্থা চালু করার পর থেকে পাসপোর্ট করা আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত হয়েছে। তবে আবেদনকারীদের মনে সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্ন থাকে, পাসপোর্ট করতে কত টাকা লাগে ২০২৬? অথবা ১০ বছর মেয়াদি ই পাসপোর্ট ফি কত?
সাম্প্রতিক সময়ে পাসপোর্ট ফি জমা দেওয়া, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং আবেদন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। ঘরে বসেই এখন মোবাইল ব্যাংকিং বা এ-চালানের মাধ্যমে ফি জমা দেওয়া যায়। আজকের এই বিস্তারিত গাইডে আমরা ই-পাসপোর্ট ফি, পাসপোর্ট রিনিউ করার নিয়ম, ফি জমার ব্যাংক তালিকা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে সব ধরনের আপডেট তথ্য জানব।
ই পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে ২০২৬?
অনলাইনে ই-পাসপোর্টের আবেদন করার আগে কিছু প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস সাথে রাখা আবশ্যক। বয়সভেদে এই কাগজপত্রের কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে:
- প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য (২০ বছরের ঊর্ধ্বে): মূল জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা স্মার্ট কার্ডের কপি বাধ্যতামূলক।
- ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সীদের জন্য: জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ (BRC English Version) যেকোনো একটি হলেই চলবে।
- ১৮ বছরের নিচে পাসপোর্ট করার নিয়ম: ১৮ বছরের কম বয়সীদের এনআইডি না থাকায় তাদের ক্ষেত্রে অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ (BRC) এবং পিতা-মাতা উভয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি জমা দিতে হবে।
- সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য: প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরকারি আদেশ (GO), অনাপত্তি সনদ (NOC), অবসরোত্তর ছুটির আদেশ (PRL Order) অথবা পেনশন বই দাখিল করতে হবে।
- অন্যান্য সনদ: পেশা প্রমাণের জন্য টেকনিক্যাল সনদ (যেমন: ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ড্রাইভার) এবং বিবাহিতদের ক্ষেত্রে কাবিননামা বা তালাকপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে তালাকনামা সংযুক্ত করতে হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ই-পাসপোর্টের আবেদনের ক্ষেত্রে কোনো ছবি সত্যায়ন বা কাগজপত্রে চেয়ারম্যান/গেজেটেড কর্মকর্তার সত্যায়নের প্রয়োজন নেই।
পাসপোর্ট ফি ২০২৬
ই-পাসপোর্টের ফি মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: পাসপোর্টের পৃষ্ঠাসংখ্যা (৪৮ বা ৬৪ পাতা) এবং মেয়াদ (৫ বা ১০ বছর)। এছাড়া ডেলিভারির সময়ের ওপর ভিত্তি করে ফি তিন ভাগে বিভক্ত: রেগুলার (সাধারণ), এক্সপ্রেস (জরুরী) এবং সুপার এক্সপ্রেস (অতীব জরুরী)।
অনেকেই অনলাইনে ভুল তথ্যের কারণে বিভ্রান্ত হন। জেনে রাখা ভালো, সরকারি নির্ধারিত নিচের ফি-গুলোর মধ্যে ১৫% ভ্যাট আগে থেকেই সংযুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ এর বাইরে আপনাকে অতিরিক্ত কোনো ভ্যাট দিতে হবে না।

৫ বছর মেয়াদি ই পাসপোর্ট ফি
৪৮ পাতার ক্ষেত্রে:
- নিয়মিত বিতরণ (১৫-২১ দিন): ৪,০২৫ টাকা
- জরুরী বিতরণ (৭-১০ দিন): ৬,৩২৫ টাকা
- অতীব জরুরী বিতরণ (২ দিন): ৮,৬২৫ টাকা
৬৪ পাতার ক্ষেত্রে:
- নিয়মিত বিতরণ (১৫-২১ দিন): ৬,৩২৫ টাকা
- জরুরী বিতরণ (৭-১০ দিন): ৮,৬২৫ টাকা
- অতীব জরুরী বিতরণ (২ দিন): ১২,০৭৫ টাকা
১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট ফি ২০২৬
দীর্ঘমেয়াদী ভ্রমণের জন্য ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট সবচেয়ে সুবিধাজনক। তবে ১৮ বছরের নিচে এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে কেবল ৫ বছর মেয়াদি (৪৮ পাতা) পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।
৪৮ পাতার ক্ষেত্রে:
- নিয়মিত বিতরণ: ৫,৭৫০ টাকা
- জরুরী বিতরণ: ৮,০৫০ টাকা
- অতীব জরুরী বিতরণ: ১০,৩৫০ টাকা
৬৪ পাতার ক্ষেত্রে:
- নিয়মিত বিতরণ: ৮,০৫০ টাকা
- জরুরী বিতরণ: ১০,৩৫০ টাকা
- অতীব জরুরী বিতরণ: ১৩,৮০০ টাকা
পাসপোর্ট ফি জমা ব্যাংক ২০২৬ ও অনলাইন পেমেন্ট
পাসপোর্ট ফি জমা দেওয়া এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ। আপনি চাইলে ঘরে বসেই অনলাইনে অথবা অফলাইনে ব্যাংকের মাধ্যমে (e passport fee bank list) ফি জমা দিতে পারেন।
অনলাইন পেমেন্ট (ekpay): বাংলাদেশ সরকারের ekpay.gov.bd পোর্টালের মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই VISA, Master Card, American Express ব্যবহার করে পেমেন্ট করতে পারবেন। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং যেমন- বিকাশ (bKash), নগদ (Nagad), রকেট (Rocket), উপায় (Upay) ইত্যাদির মাধ্যমেও ফি জমা দেওয়া যায়।
অফলাইন বা ব্যাংক পেমেন্ট (A-Challan): আপনি যদি ব্যাংকে গিয়ে টাকা জমা দিতে চান, তবে এ-চালান (A-Challan) এর মাধ্যমে দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রায় সব ব্যাংকেই টাকা জমা দিতে পারবেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- সোনালী ব্যাংক (Sonali Bank)
- ওয়ান ব্যাংক (One Bank)
- প্রিমিয়ার ব্যাংক (Premier Bank)
- ট্রাস্ট ব্যাংক (Trust Bank)
- ব্যাংক এশিয়া (Bank Asia)
- ঢাকা ব্যাংক (Dhaka Bank)
ই পাসপোর্ট করার নিয়ম ও আবেদন ফরম
ই-পাসপোর্ট করার পুরো প্রক্রিয়াটি এখন ডিজিটাল। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে খুব সহজেই আবেদন সম্পন্ন করা যায়:
১. অনলাইন রেজিস্ট্রেশন: প্রথমে বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট পোর্টালে (epassport.gov.bd) একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।
২. পাসপোর্ট আবেদন ফরম ২০২৬ পূরণ: আপনার এনআইডি বা জন্মনিবন্ধন সনদ অনুযায়ী নির্ভুলভাবে সকল তথ্য পূরণ করুন।
৩. ফি পরিশোধ: উপরে উল্লেখিত অনলাইন বা অফলাইন পদ্ধতির যেকোনো একটি ব্যবহার করে আপনার পছন্দমতো মেয়াদ ও পাতার ফি পরিশোধ করুন।
৪. অ্যাপয়েন্টমেন্ট গ্রহণ: ফি পরিশোধের পর বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও ছবি তোলা) দেওয়ার জন্য একটি তারিখ বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট শিডিউল নির্বাচন করুন।
৫. অফিসে উপস্থিতি: নির্ধারিত তারিখে প্রিন্ট করা আবেদনপত্র, পেমেন্ট স্লিপ এবং মূল এনআইডি/জন্মনিবন্ধন নিয়ে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হোন।

পাসপোর্ট রিনিউ করার নিয়ম ও রিনিউ ফি
যাদের আগের হাতে লেখা বা এমআরপি (MRP) পাসপোর্ট আছে, তাদের নতুন করে ই-পাসপোর্ট করতে হবে। একে পাসপোর্ট রি-ইস্যু বা রিনিউ বলা হয়।
পাসপোর্ট রিনিউ ফি ২০২৬
পাসপোর্ট নবায়ন ফি বা রিনিউ ফি আলাদা কিছু নয়। নতুন পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে যে ফি নির্ধারিত (যেমন- ১০ বছরের জন্য ৫,৭৫০ টাকা), রিনিউ করার ক্ষেত্রেও ঠিক একই ফি জমা দিতে হবে।
পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে বা সংশোধন ফি
পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে দ্রুত থানায় জিডি (GD) করতে হবে। এরপর জিডি কপিসহ রি-ইস্যুর আবেদন করতে হবে। পাসপোর্ট সংশোধনের ক্ষেত্রেও (নাম, বয়স, ঠিকানা পরিবর্তন) নতুন পাসপোর্টের সমপরিমাণ ফি প্রযোজ্য হবে। তবে তথ্য সংশোধনের জন্য উপযুক্ত প্রমাণপত্র (যেমন- হলফনামা, ম্যারেজ সার্টিফিকেট ইত্যাদি) দাখিল করতে হবে।
ডেলিভারি সময় ও পুলিশ ভেরিফিকেশন আপডেট
পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে ডেলিভারি সময় নির্ভর করে আপনি কোন ফি জমা দিয়েছেন তার ওপর। সাধারণ ডেলিভারি ১৫ থেকে ২১ দিন, এক্সপ্রেস ৭ থেকে ১০ দিন এবং সুপার এক্সপ্রেস ২ দিনের মধ্যে প্রদান করা হয়।
সরকারি চাকরিজীবী যাদের এনওসি (NOC) বা পিআরএল (PRL) রয়েছে, তারা রেগুলার ফি দিয়ে এক্সপ্রেস সুবিধা এবং এক্সপ্রেস ফি দিয়ে সুপার এক্সপ্রেস সুবিধা পেয়ে থাকেন।
পুলিশ ভেরিফিকেশন আপডেট
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করার লক্ষ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নিয়মে বড় ধরনের শিথিলতা আনা হয়েছে। পূর্বে পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য দীর্ঘ সময় লাগলেও, বর্তমানে ডিজিটাল ডেটাবেজ ও এনআইডি সার্ভারের মাধ্যমে দ্রুত নাগরিক তথ্য যাচাই করা হচ্ছে, ফলে গ্রাহকরা এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত পাসপোর্ট হাতে পাচ্ছেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১০ বছর মেয়াদি ই পাসপোর্ট করতে কত টাকা লাগে?
১০ বছর মেয়াদি ৪৮ পাতার সাধারণ ই-পাসপোর্ট ফি ৫,৭৫০ টাকা। আর যদি ৬৪ পাতার ই-পাসপোর্ট করতে চান, তবে সাধারণ ফি ৮,০৫০ টাকা। এর সাথে কোনো অতিরিক্ত ভ্যাট দিতে হবে না।
পাসপোর্ট রিনিউ করতে কত টাকা লাগে?
পাসপোর্ট রিনিউ বা নবায়ন ফি নতুন পাসপোর্টের ফি-এর সমান। আপনি কত পাতা এবং কত মেয়াদের পাসপোর্ট রিনিউ করতে চাচ্ছেন, তার ওপর ভিত্তি করে ৪,০২৫ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৩,৮০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে ২০২৬?
সাধারণ নাগরিকদের জন্য মূল জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং অনলাইন পূরণকৃত আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি ও পেমেন্ট স্লিপ লাগে। ১৮ বছরের নিচে হলে জন্মনিবন্ধন ও পিতা-মাতার এনআইডি লাগে। কোনো ছবির প্রয়োজন নেই।
নীল পাসপোর্ট এর সুবিধা কী?
নীল রঙের পাসপোর্ট বা অফিশিয়াল পাসপোর্ট সরকারি কাজে বিদেশ ভ্রমণের জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া হয়। এই পাসপোর্টের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বিশ্বের অনেক দেশে ভ্রমণের জন্য পূর্বানুমতি বা ভিসার প্রয়োজন হয় না এবং এয়ারপোর্টে ভিআইপি সুবিধা পাওয়া যায়।
ই পাসপোর্ট ফি মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে দেওয়া যায় কি?
হ্যাঁ, ekpay.gov.bd গেটওয়ে ব্যবহার করে আপনি খুব সহজেই বিকাশ, নগদ, রকেট এবং উপায়ের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে আপনার পাসপোর্টের ফি জমা দিতে পারবেন।