বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি ২০২৬ | কাবিনের সরকারি ফি কত
আমাদের সমাজে বিবাহ এবং তালাক—উভয় ক্ষেত্রেই আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করা অত্যন্ত জরুরি। তবে অনেকেই জানেন না যে, বিবাহ বা তালাক নিবন্ধনের জন্য সরকার নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট ফি রয়েছে। সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই কাজী অফিসে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচের সম্মুখীন হন।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা ২০০৯ (সংশোধিত) অনুযায়ী কাবিন নামার সরকারি ফি এবং ডিভোর্সের খরচে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট এবং সরকারি গেজেট অনুযায়ী বিবাহ রেজিস্ট্রেশন ফি, কাবিন লাখে কত টাকা, ডিভোর্স দিতে কত টাকা লাগে এবং দেনমোহর সংক্রান্ত আইনি বিধানগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
কাবিনের সরকারি ফি বা বিবাহ রেজিস্ট্রেশন ফি ২০২৬
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রারদের ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। দেনমোহরের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করেই মূলত এই ফি নির্ধারিত হয়। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী কাবিনের সরকারি ফি হিসাব করার পদ্ধতি নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
- ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত কাবিন: দেনমোহরের পরিমাণ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হলে, প্রতি ১,০০০ (এক হাজার) টাকা দেনমোহর বা এর অংশবিশেষের জন্য ১৪ টাকা হারে রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হবে।
- ৫ লক্ষ টাকার বেশি কাবিন: দেনমোহরের পরিমাণ ৫ লক্ষ টাকার বেশি হলে, প্রথম ৫ লক্ষ টাকার জন্য ১৪ টাকা হারেই ফি দিতে হবে। তবে ৫ লক্ষ টাকার পর থেকে পরবর্তী প্রতি ১ লক্ষ টাকা বা এর অংশবিশেষের জন্য অতিরিক্ত ১০০ টাকা হারে ফি প্রদান করতে হবে।
- সর্বনিম্ন ফি: কাবিনের পরিমাণ বা দেনমোহর যত কমই হোক না কেন, বিবাহ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি কোনোভাবেই ২০০ টাকার কম হবে না।

উদাহরণস্বরূপ কাবিনের গাণিতিক হিসাব:
- ১ লক্ষ টাকা কাবিন হলে: ১ লাখ টাকার জন্য ফি হবে (১০০ × ১৪) = ১,৪০০ টাকা।
- ৩ লক্ষ টাকা কাবিন হলে: ৩ লাখ টাকার জন্য ফি হবে (৩০০ × ১৪) = ৪,২০০ টাকা।
- ৫ লক্ষ টাকা কাবিন হলে: ৫ লাখ টাকার জন্য ফি হবে (৫০০ × ১৪) = ৭,০০০ টাকা।
- ১০ লক্ষ টাকা কাবিন হলে: প্রথম ৫ লাখের জন্য ৭,০০০ টাকা এবং পরবর্তী ৫ লাখের জন্য (৫ × ১০০) = ৫০০ টাকা। অর্থাৎ, মোট ফি হবে ৭,৫০০ টাকা।
বিবাহ ও তালাকের অন্যান্য আনুষঙ্গিক ফি
রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধনের মূল ফি ছাড়াও সরকারি গেজেটে আরও কিছু ফি নির্ধারণ করা আছে:
- বিবাহ ও তালাকের জন্য কমিশন ফি: ৫০ টাকা।
- কমিশনে যাতায়াত বাবদ ফি: প্রতি ১ কিলোমিটারের জন্য ১০ টাকা।
- বহি তল্লাশি ফি: ১০ টাকা।
- অনুলিপি প্রাপ্তি ফি: ৫০ টাকা।
জ্ঞাতব্য: বিবাহ নিবন্ধন ফি বর কর্তৃক প্রদেয় এবং তালাকের জন্য (চাহিদা অনুযায়ী) যে কোন পক্ষ হইতে প্রদান করিবে। এর বাইরে কাজী অফিসে যাতায়াত বা আনুষঙ্গিক খরচের নামে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
ডিভোর্স দিতে কত টাকা লাগে ২০২৬ (তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি)
বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হলেও আইনি বাধ্যবাধকতায় এর সঠিক নিবন্ধন অপরিহার্য। মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী তালাক নামা বা ডিভোর্স রেজিস্ট্রেশনের জন্যও সরকার নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজী একটি তালাক নিবন্ধনের জন্য (বি/সি/ডি) সরকারি ফি হিসেবে ১,০০০ (এক হাজার) টাকা গ্রহণ করতে পারবেন। এর আগে এই ফি ছিল ৫০০ টাকা, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করা হয়েছে। ডিভোর্স নোটিশ পাঠানো এবং আনুষঙ্গিক যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আরও কিছু খরচ হতে পারে, তবে মূল তালাক নামা সরকারি ফি ১,০০০ টাকাই।
দেনমোহর সর্বনিম্ন কত টাকা হতে পারে?
দেনমোহর বা মোহরানা হলো বিয়ের সময় কনের প্রাপ্য একটি সম্মানজনক আর্থিক অধিকার, যা স্বামী পরিশোধ করতে বাধ্য। অনেক সময়ই প্রশ্ন ওঠে, দেনমোহর সর্বনিম্ন কত টাকা হতে পারে?
ইসলামি শরিয়াহ বা বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম বিবাহ আইনে দেনমোহরের সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ বেঁধে দেওয়া হয়নি। এটি সম্পূর্ণভাবে বর ও কনের পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা, বরের আয় এবং উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। তবে আইন অনুযায়ী, দেনমোহর এমন একটি পরিমাণ হওয়া উচিত যা বরের পরিশোধ করার সামর্থ্য রয়েছে। লোক দেখানো অতিরিক্ত দেনমোহর নির্ধারণ করা আইনত ও সামাজিকভাবে অনুচিত।
স্ত্রী তালাক দিলে দেনমোহর পাবে কি?
এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। স্ত্রী তালাক দিলে দেনমোহর পাবেন কি না, তা নির্ভর করে তালাকটি কোন পদ্ধতিতে হচ্ছে তার ওপর:
- তালাক-ই-তৌফিজ (ক্ষমতাপলব্ধ তালাক): কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে যদি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করা হয়ে থাকে এবং স্ত্রী যদি স্বামীর দোষ বা আইনি কারণ দেখিয়ে সেই ক্ষমতার বলে তালাক প্রদান করেন, তবে স্ত্রী তার সম্পূর্ণ দেনমোহর পাওয়ার আইনগত অধিকার রাখেন।
- খুলা তালাক (পারস্পরিক সম্মতি): যদি স্ত্রী নিজের ইচ্ছায় স্বামীর বিনা দোষে বিবাহ বিচ্ছেদ চান এবং স্বামী তাতে সম্মত হন (যাকে খুলা তালাক বলা হয়), সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে সাধারণত তার দেনমোহরের দাবি ছেড়ে দিতে হয়। স্বামী চাইলে দেনমোহর মাফ করে দেওয়ার শর্তে ডিভোর্সে রাজি হতে পারেন।
তালাকের পর সন্তানের ভরণপোষণ কত টাকা?
বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তানের কাস্টডি (হেফাজত) যার কাছেই থাকুক না কেন, সন্তানের ভরণপোষণের সম্পূর্ণ আইনি এবং ধর্মীয় দায়িত্ব পিতার ওপর বর্তায়। সন্তানের খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের স্বাভাবিক খরচ পিতাকেই বহন করতে হবে।
ভরণপোষণের নির্দিষ্ট কোনো অংক আইনে বলা নেই। পিতার আয় এবং সন্তানের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক মানের ওপর ভিত্তি করে পারিবারিক আদালত এই ভরণপোষণের টাকা নির্ধারণ করে দেন। পিতা যদি স্বেচ্ছায় খরচ না দেন, তবে মাতা পারিবারিক আদালতে মামলা করে সন্তানের ভরণপোষণ আদায় করতে পারেন।
কোর্ট ম্যারেজ এর খরচ কত?
অনেকেই কাজী অফিসে না গিয়ে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ের ঘোষণা দিয়ে থাকেন, যা সমাজে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে পরিচিত। মূলত এটি একটি এফিডেভিট বা হলফনামা। কোর্ট ম্যারেজ সম্পন্ন করতে সাধারণত ১,০০০ থেকে ২,০০০ টাকার মতো খরচ হয় (আইনজীবীর ফি এবং স্ট্যাম্প খরচসহ)।
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু কোর্ট ম্যারেজ করলেই সেটি আইনত পূর্ণাঙ্গ বিবাহ হিসেবে গণ্য হয় না। আইনি বৈধতা পাওয়ার জন্য মুসলিম আইন অনুযায়ী কাজী অফিসে গিয়ে সরকারি ফি দিয়ে কাবিননামা রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
কাবিন লাখে কত টাকা সরকারি ফি দিতে হয়?
দেনমোহর ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হলে প্রতি লাখে ১,৪০০ টাকা সরকারি ফি দিতে হয়। ৫ লক্ষ টাকার বেশি হলে প্রথম ৫ লাখের পর পরবর্তী প্রতি লাখ বা এর অংশের জন্য ১০০ টাকা করে ফি যুক্ত হয়।
কাজী সাহেব অতিরিক্ত ফি দাবি করলে কী করণীয়?
কাজী যদি সরকার নির্ধারিত ফি-এর চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন, তবে আপনি স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) অথবা জেলা রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত অভিযোগ জানাতে পারেন।
বিয়ের রেজিস্ট্রি কাগজ বা কাবিননামা তুলতে কত টাকা লাগে?
সরকারের সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, কাবিননামার অনুলিপি প্রাপ্তি ফি বা বিয়ের রেজিস্ট্রি কাগজ তোলার ফি হিসেবে ৫০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।
দেনমোহর মামলার কোর্ট ফি কত?
পারিবারিক আদালতে দেনমোহর আদায়ের মামলা করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কোর্ট ফি বা স্ট্যাম্প ডিউটির বড় খরচ নেই। সাধারণত নামমাত্র মূল্যের কোর্ট ফি (যেমন- ২৫ থেকে ৩০০ টাকা) দিয়ে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায়।
দেনমোহর পরিশোধ না করলে কী হয়?
দেনমোহর স্ত্রীর আইনগত অধিকার। স্বামী দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন। আদালত স্বামীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে বা অন্য উপায়ে দেনমোহর আদায়ের নির্দেশ দিতে পারেন।

