প্রাইমারি শিক্ষকদের বেতন কত ২০২৬ | প্রাথমিক শিক্ষকদের নতুন পে-স্কেলের খবর
দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার মূল কারিগর হলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বিগত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়েছে, সেই অনুপাতে শিক্ষকদের বেতন বাড়েনি। ফলে ‘প্রাইমারি শিক্ষকদের বেতন কত’ বা ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক বেতন স্কেল’ নিয়ে শিক্ষক সমাজের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের নতুন পে-স্কেলের (নবম জাতীয় পে-স্কেল) খবরে শিক্ষকদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। আজকের এই নিবন্ধে আমরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বর্তমান বেতন স্কেল (primary teacher salary in bangladesh), ইনক্রিমেন্ট, বিশেষ সুবিধা এবং ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেলে তাদের বেতন কত হতে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
প্রাইমারি সহকারী শিক্ষক কত তম গ্রেড?
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড নিয়ে দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও পরিবর্তনের ইতিহাস রয়েছে। পূর্বে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা ১৪তম গ্রেডে এবং প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকরা ১৫তম গ্রেডে বেতন পেতেন।
তবে, শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার বেতন বৈষম্য দূর করতে এই গ্রেড পরিবর্তন করে। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল সহকারী শিক্ষক (প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং প্রশিক্ষণবিহীন উভয়ই) ১৩ তম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন। অর্থাৎ, প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ১৩তম গ্রেডের কর্মচারী।
১৩ তম গ্রেডে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কত ২০২৬?
২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী, একজন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকের (১৩ তম গ্রেড) বেতনের হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
- মূল বেতন (বেসিক): ১১,০০০ টাকা (বেতনক্রম: ১১,০০০ – ২৬,৫৯০ টাকা)
- বাড়ি ভাড়া ভাতা: সাধারণত মূল বেতনের ৪৫%, ৫০% বা ৬০% (পোস্টিংয়ের স্থানের ওপর ভিত্তি করে। তবে নূন্যতম ৪৫% হিসেবে ৪,৯৫০ টাকা)।
- চিকিৎসা ভাতা: ১,৫০০ টাকা
- টিফিন ভাতা: ২০০ টাকা
সব মিলিয়ে চাকরিতে যোগদানের পর একজন নতুন সহকারী শিক্ষক শুরুতে প্রায় ১৭,৬৫০ টাকার মতো মোট বেতন পেয়ে থাকেন।
তবে মনে রাখতে হবে, চাকরি জীবনের শুরুতে এই বেতন হলেও, প্রতি বছর বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং অন্যান্য বিশেষ সুবিধার কারণে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের বেতন ৩৫,০০০ থেকে ৩৭,০০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
প্রাইমারি প্রধান শিক্ষক কততম গ্রেড এবং বেতন কত?
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা এবং গ্রেড সহকারী শিক্ষকদের তুলনায় বেশি।
- গ্রেড: বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা ১০ম গ্রেডে বেতন পেয়ে থাকেন (পূর্বে এটি ১১তম বা ১২তম গ্রেড ছিল)।
- বেতন স্কেল: ১০ম গ্রেডের বেতনক্রম হলো ১৬,০০০ – ৩৮,৬৪০ টাকা।
- বেতন কত: একজন নতুন পদোন্নতিপ্রাপ্ত বা সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মূল বেতন শুরু হয় ১৬,০০০ টাকা থেকে। এর সাথে আনুপাতিক হারে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও টিফিন ভাতা যোগ হয়ে মাস শেষে তারা প্রায় ২৫,০০০ টাকার বেশি প্রাথমিক বেতন হাতে পান।
নোট: সহকারী শিক্ষকরা ৪ থেকে ৭ বছর সন্তোষজনক চাকরি করার পর পদোন্নতি পেয়ে ১১তম বা ১০ম গ্রেডে (প্রধান শিক্ষক হিসেবে) উন্নীত হতে পারেন।
বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং বিশেষ প্রণোদনা ২০২৬
সরকারি চাকরিজীবীদের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও প্রতি বছর ১ জুলাই বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হয়।
৫% ইনক্রিমেন্ট: সাধারণত মূল বেতনের ওপর ৫% হারে ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হয়। অর্থাৎ, ১৩তম গ্রেডে ১১,০০০ টাকা মূল বেতনের একজন শিক্ষকের প্রথম ইনক্রিমেন্ট হবে ৫৫০ টাকা। এর ফলে পরের বছর তার মূল বেতন হবে ১১,৫৫০ টাকা এবং এই নতুন বেতনের ওপর ভিত্তি করেই তার বাড়ি ভাড়া নির্ধারিত হবে।
বিশেষ সুবিধা বা প্রণোদনা:
সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে সরকার কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুবিধার (Special Benefit) ঘোষণা দিয়েছে, যা গ্রেড অনুযায়ী ভিন্ন:
- ১ম থেকে ৯ম গ্রেড: কর্মকর্তারা মূল বেতনের ১০% হারে বিশেষ সুবিধা পাবেন।
- ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড: প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক (১৩তম) এবং প্রধান শিক্ষকরা (১০ম) তাদের মূল বেতনের ১৫% হারে এই বিশেষ সুবিধা প্রাপ্য হবেন।
উদাহরণস্বরূপ: ১৩তম গ্রেডের ১১,০০০ টাকা বেসিকের একজন শিক্ষক ১৫% হারে ১,৬৫০ টাকা বিশেষ প্রণোদনা পাবেন, যা তার মোট বেতনের সাথে যুক্ত হবে।
প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কি বাড়বে?
দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল (২০২৬) বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই নতুন পে-স্কেলে প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য রয়েছে বড় সুখবর।
গ্রেড উন্নয়নের প্রস্তাবনা:
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছে। এই প্রস্তাবনা অনুযায়ী:
- সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড: ১৩তম গ্রেড থেকে উন্নীত করে ১২তম বা ১১তম গ্রেডে নিয়ে যাওয়ার আলোচনা চলছে।
- প্রধান শিক্ষকদের গ্রেড: ১১তম/১০ম গ্রেড থেকে উন্নীত করে সরাসরি ১০ম বা ৯ম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে।
অন্যান্য ভাতার প্রস্তাবিত পরিবর্তন:
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে নিচের ভাতাগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে:
- টিফিন ভাতা: বর্তমান ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
- বৈশাখী ভাতা: মূল বেতনের ২০% থেকে বাড়িয়ে ৫০% করার প্রস্তাব রয়েছে।
- শিক্ষা ভাতা: সন্তানদের জন্য শিক্ষা ভাতা ১,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২,০০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে ধাপে ধাপে এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে পারে।
১৩ তম গ্রেডে মূল বেতন ও ১৫% বিশেষ সুবিধার তালিকা
নিচে ১৩ তম গ্রেডের (সহকারী শিক্ষক) মূল বেতন বৃদ্ধির ধাপে ধাপে ১৫% হারে বিশেষ সুবিধা কত টাকা বাড়বে, তার একটি চার্ট দেওয়া হলো:
| মূল বেতনের ধাপ (টাকা) | ১৫% হারে বিশেষ সুবিধা (টাকা) |
| ১১,০০০ | ১,৬৫০ |
| ১১,৫৫০ | ১,৭৩২ |
| ১২,১৩০ | ১,৮১৯ |
| ১২,৯৪০ | ১,৯১১ |
| ১৩,৩৮০ | ২,০০৭ |
| ১৪,০৫০ | ২,১০৭ |
| … | … |
| ২৬,৫৯০ (সর্বোচ্চ ধাপ) | ৩,৯৮৮ |
(উপরের চার্টটি আনুমানিক হিসাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, প্রকৃত অঙ্ক সামান্য ভিন্ন হতে পারে)।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রাইমারি সহকারী শিক্ষকদের বর্তমান বেতন স্কেল কত?
বর্তমানে প্রাইমারি সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে বেতন পান। তাদের মূল বেতন স্কেল হলো ১১,০০০ থেকে ২৬,৫৯০ টাকা।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন কত?
প্রধান শিক্ষকরা ১০ম গ্রেডে বেতন পান। তাদের মূল বেতন শুরু হয় ১৬,০০০ টাকা থেকে। আনুষঙ্গিক ভাতা যুক্ত হয়ে শুরুতে তারা প্রায় ২৫,০০০ টাকার বেশি পান।
প্রাইমারি শিক্ষকরা কি বিশেষ সুবিধা বা প্রণোদনা পান?
হ্যাঁ, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মতো প্রাথমিক সহকারী এবং প্রধান শিক্ষকরাও তাদের মূল বেতনের ১৫% হারে বিশেষ সুবিধা বা প্রণোদনা পেয়ে থাকেন।
নতুন পে-স্কেলে প্রাথমিক শিক্ষকদের গ্রেড কি পরিবর্তন হবে?
একটি প্রস্তাবনা অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড থেকে ১২তম বা ১১তম গ্রেডে এবং প্রধান শিক্ষকদের ১০ম থেকে ৯ম গ্রেডে উন্নীত করার আলোচনা চলছে। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
প্রাইমারি শিক্ষকদের টিফিন ভাতা কত?
বর্তমানে অষ্টম পে-স্কেল অনুযায়ী শিক্ষকরা মাসিক ২০০ টাকা টিফিন ভাতা পান। তবে প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেলে এটি বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।





